Sunday, May 8, 2022

যে পথে হাঁটছি...

চৈতালি ধরিত্রীকন্যা 'যে পথে হাঁটছি'র পাঠ-প্রতিক্রিয়া 

আলোচক: অমিত দাস 

 


১.

'কেমন করে ঠোঁট কাঁপে গরম চা দেখে? দুটি পাতা একটি কুঁড়ির ডুয়ার্স-সুন্দরী। তোমার পার ভাঙা কুলে জলপাই ছায়া নেমে আসে। তোমার ভাঙা কুলোর শরীরে পোড়া উত্তাপের ছাই ছড়ায়। তোমার মসৃণতায় ছন্দ-পতন হয়। তুমি নিয়মিত স্নান সেরে নিতে পারো না। তুমি ধর্ষিত হও। তোমার মনের হাড় মাংসে প্রাচীন ছায়া পড়ে। চা কন্যা তোমার অববাহিকায় বার বার ঝুম চাষ হয় অথচ তুমি শুকনো স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে । তোমার যৌবন শুকিয়ে যায়। বুকের কালো কালো রিডে তালা ঝোলে । তুমি স্তব্ধ হও ।'(৩২)

'মানসাই-এর চর । কাশফুলের সাদা চুষে চুষে খাক্ । অথবা তরমুজ কামড়ে খাক্ বালিতে শুয়ে। এভাবেই উদ্দেশ্যের মধ্যে পেঁচিয়ে থাকে বিধেয়ের সবস্বতা । বালির চরে বালির ঘর। এক বাণেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় অভিধানের প্রতিটি পাতা। আকাশকে ক’জন চেনে। দূরদৃষ্টির নাবিকও কম্পাসের কম্পন কখনো-কখনো বোঝে না।'(৫)

/'সুটুঙ্গার জল প্রতিবছরই বিজয়ার পান্তাভাত খান । ডিঙিগুলো সবুজ জলে দশমীর আবির মাখে। আর নৌকোর ভীড়ে বিসর্জনী গান তাকিয়ে থাকে কোজাগরি চাঁদের দিকে। জল থই থই। ভেলার ভাসান। আলোর রোশনাই। আমি দশমীর ঘটে তোর্ষার জল ভরে রাখি।'(৬)

'এই পথ দিয়ে দৌড়ে শিশুরা নরনারায়ণ পার্কের দেবদারু শরীরে বিকেল ভেজায় আপন খেয়ালে। আজকের মতো কোনো টিকিটঘর, লোহার গেট পথ আগলে রাখত না ‘সেলফিস্ জায়েন্ট’-এর মতো। শিশুমন আজ শৃঙ্খলের বিশৃঙ্খলায় শেকলবাঁধা। কৈশোর আজ আলুথালু ঘুরে বেড়ায় পথে ঘাটে ।'(৮)

***********

২.

'চুরি হয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্ক শারীরিক শ্রমে। চুরি হয়ে যাচ্ছে স্বদেশ মৃত্তিকার প্রেমানুভূতি। চুরি হয়ে যাচ্ছে রক্তের সম্পর্কের, আত্মার সম্পর্কের, চাক্ষুষ সম্পর্কের প্রাণবায়ু। ‘দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে’ সেও কত বুকে জড়িয়ে প্রিয়জনের মতো হু হু কেঁদে ওঠে বিদেশ বিভোরে হঠাৎ দেখা কোনো স্বদেশি অপরিচিত জন ।

চকচকে তলোয়ারের অগ্রভাগে কোন্ ষড়যন্ত্র মহামূল্যবান রক্তের স্বাদ নেয়।'(২৩)

***********

৩.

'সমুদ্র পাড়ের মানুষ একবার দেখেছিল পদ্মের পাপড়ি থেকে উঠে আসা ত্রিশূলের লকলকে জিভ। কখনও থমথমে আঁতকে ওঠা আচমকা ভয়ের শরীর থেকে পিচঢালা রাস্তার গায়ে কাঁচা গলির মুখে রক্ত ফোঁটা ফেলেছিল কে বা কারা। বিবশ পথ দিয়ে জাহানারা হেঁটে যায় মৃত্যু শিবিরের দিকে। উলঙ্গ নারী আর শিল্প ভাস্কর্যের অবাক করে দেয়া শরীর মোহময় থাকে না যখন তার দেহে নখের আঁচড় লাগে । গীতা বেন কোথায় তোমার বাসা কোথায় তোমার ঘর। বোন তোর হৃদয়তীরে মুক্ত পাখি ত্রিশূলের ডগায় ডানা ঝাপটায় । ত্রিশূলের ডগায় কোরাণ পত্র, ত্রিশূলের ডগায় তার অণ্ডকোষের অগ্রভাগ ।'(২৭)

************

৪.

এপথেই মানুষজন থুথু ফেলিয়া সেই থুথুই নিজে চাটিয়া লন। আমি দেখি বিদ্যুৎচুল্লির খোলা দরজা ।

রাজপাট! তুমি ‘নিরুত্তর'।(৩৩)

কলঙ্কের আর এক নাম যদি পরিহাস হয় তবে তার আর এক নাম রাখি লবণহ্রদ ।

মনের খোরাক পেতে দেহের নুন চোষে যারা তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে কতটা পালক খসে পড়লে পায়বার রং আর সাদা থাকে না ।(৭০)

************

৫.

মাতৃদুগ্ধেই তোর প্রথম গলা ভেজানো। মায়ের হৃদয়, মাতৃমনের মুগ্ধতা আনতে তোমাকে সেই গলা জলে নেমেই আরাধনা করতে হয়। এখনও পৃথিবী কাঁপে তারই মহিমায় ।

মাতৃত্বের আর এক নাম গঙ্গাজল ।(৪৬)

********

৬.

ভালোবাসার পাশে একটি জীবন্ত প্রেম নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। সকালের কচি রোদের শরীরে উত্তাপ নামে। আর সিল্ক স্ক্রিনে প্রেমের আলিঙ্গনের প্রতিটি মুহূর্ত প্রাণোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। প্রেমার্ঘ কার? প্রেমই প্রেমকে রচনা করে। ফুল বাগিচার পোশাকে নানান রং লাগে। মন পড়শি। চারদিকে সোনালি রোদ ওঠে। এ পথের আকাশ পৃথিবীর দিগন্ত ছুঁতে চায়। চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে এক পশলা আত্মকাহন গেয়ে ওঠে কেউ । চুর্ণিতে ফোঁটা ফোঁটা হলুদ লাগে । আর চড়ুই পাখির বাসার মতো অধিকার নিয়ে প্রেম। শাওয়ারের নীচে নিজস্ব তানবাহার।(৫৩)

সে কি দেখে ধানের হলদে নাভি? কোনোদিন?

অবচেতনেই বয়ে যায় ভালোবাসা। বৃষ্টি আসে। গৌরচন্দ্রিকায় লজ্জা নামে। নিজেকে বন্দি রাখা যায় না কোনোভাবেই। সকাল-দুপুর সন্ধ্যার নোনা রোদে তবু ঢুকে পড়ে সংযত আধার ।

৫১.

ট্রামবাসগুলির আর বিরাম নেই। যৌবন মানে না দুর্যোগ। প্রেম হয়ে যায় সিনেমা হলে, মেলার মাঠে, বিবাহ বাসরে, টিভির পর্দায়, খেলার মাঠে। চুপি চুপি প্রেম হয়ে যায় দুর্গোৎসবের নতুন পোশাকে । হোলির রামধনুর ধাঁধা ধরা মুখমণ্ডলে। ঈদের অবুঝ চোখে অথবা বড়োদিনের উদারকোণে। প্রেম হেঁটে যায় পার্কের সবুজ গালিচায় । আধপোড়ো দালানবাড়ির সিঁড়ি চত্বরে প্রেম বসে থাকে । প্রেম অপেক্ষা করে পাশের সিটে অথবা বাস স্টপে। প্রেম ধীরে ধীরে হাঁটে লালমাটির ধুলো উড়িয়ে । প্রেম ছুটে যায় হলুদ মখমলি শস্যক্ষেতের আল বেয়ে গ্রাম্য জলসায় ।

৫৫.

অবলম্বনের মধ্যস্থতায় উদারমানব সুদীর্ঘ পথ হেঁটে চলে। আর ভাস্কর্যের মায়াজালে নিহত হয় প্রতিবার। বিদীর্ণ হয়। তবু উষ্ণ প্রস্রবণ। উদ্যম জাগরণ। তবু প্রশ্রয়। নোনাজল। এই হাসনুহানার বেদিভূমি । টগবগ করে বড়িশ্যাম্পু । সর্বসঙ্গম প্রাচীনতা মাড়িয়ে যায় । সৌরালয়ের পেলবদেশ থেকে রাগচূর্ণ ঊর্মি। উন্মাদনায় বাষ্পকুচি ৷ প্রবল শ্বাসে স্নায়ু দুলে ওঠে। ঘর্ষণের শব্দ। পোশাকের অন্ধকারে তিরতির বয়ে যাওয়া। গোলাপি সিঁড়ি থেকে গাঢ় নীল মঞ্চ। এঁকেবেঁকে জলজ আবেশ। রক্তাভ অভিসার থেকে মখমলি ভাষা। দীর্ঘস্নান । পরাগমিলন ঘটায় মৌতাত।

নরম বালিশ তোমার আদর তোমারই মতো।

******

৭.

সারারাত নক্ষত্রের দিকে মিছেই হিসেব কষা। ঘুম ভাঙে । অথচ আমাদের পাগল মন আবার একটু গুছিয়ে নিতে চায়। নিজের পোশাকের ওপর বর্ম পড়ে নেয়। তাই যতগুলি কথা দিয়ে গড়া যায় মুহূর্তের পর অতি মুহূর্ত ততটুকুই চাইতে হয়। ছুঁয়ে থাকে এক আন্দোলিত পথ । মানসপ্রতিমার নকশাছবি কে আঁকতে পারে?(৫৯)

অক্ষরেখায় সময় গড়ায়। পানের ডাবর লাল হলে বার বার প্রেম আসে। বৈষয়িকতার চোরাবালিতে একসময় পা ডুবে যায় আর বেনারসীর ভাঁজে লুকিয়ে পড়ে ঘুণপোকা ।

বেতবনে কালির আঁচড় লাগে । বিন্দু বিন্দু অস্থিরতায় ঝাঁঝরা হয় বুক। পিছল পথের পিচ্ছিলতা। পায়ের নীচে টুকরো কাচের বালি বিছানা । তৃষ্ণা কতটা আগুন খেলে সেতু দুর্বল হয় ।

একান্ত আত্মজন তোমরা কি কোনোদিন ক্লান্ত হও না !(৭৩)

এপথেই দম খাটো হয়ে আসে বলেই প্রিয়জনেরা চলে যায়। বিদেহী আত্মারা ঘর বাঁধে। আর নির্জনসূচে অন্ধকারগুলো এক এক করে নিজেদের জড়িয়ে রাখে। গলতে গলতে বেদনা মাটিতে মেশে। পুরোনো রক্তগুলোকে পরিষ্কার করতে পারা যায় না কোনোভাবেই। কান্না কাঁদে । জলসিঞ্চন। সীমাহীন শূন্যতা। বেড়ালকাহিনী একসময় চাপা পড়ে যায় ।

সাদারঙে মুছে দিলেই কি দাগ মোছা যায়?

আমি ঝিনুকের গায়ে আঁকাবাঁকা ত্যাগচিহ্ন দেখি ।(৭৬)

*********************************

৮.

গ্রন্থটির পরিচয় হিসেবে লেখা আছে কাব্যিক গদ্য । কাব্যিক গদ্য আসলে কবিতা নাকি গদ্য নাকি সাহিত্যের অন্য কোনো সংরূপ তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই— এই দূষিত বিতর্ক ভেঙেচুরে তা থেকে রস-নিষ্কাশনেরও আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই । লেখা তো লেখা.. আকাশ-পাতাল-বায়ু-নক্ষত্র-মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত-গাছ-যন্ত্র যাই থাকুক না কেন , সেই উদ্দেশ্যহীন ঐচ্ছিক রূপকথার জগতে কিছুক্ষণ থ হয়ে থেকে যাওয়াই পাঠকের প্রকৃত প্রাপ্তি। এই গ্রন্থটি ৭৬টি এমন জলবিন্দুর হার , এর ভাষা দুপুর রোদে তৃষ্ণার্ত পথিকের কলিজা ভেজায়। কোনোটা প্রকৃতি , আধুনিক প্রেম, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বা রাজনীতি নিয়ে তো কোনোটা সময় নিয়ে লেখা। আলোচনায় স্বল্প পরিসর ও আমার সাবালক অক্ষমতা আমাকে চালিত করছে। শুধু এটুকু বলে শেষ করব— চিন্ময় গুহ''ঘুমের দরজা ঠেলে' পড়েছিলাম , নিঃসন্দেহে ভাষা ও পড়ার শৈলীকে ভেঙেচুরে পাঠককে নতুন জামা পরিয়ে দেয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই গদ্য পাঠ করতে গিয়ে মনে হয়েছিল, সেখানে জীবনানন্দীয় বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব আছে। এখানে সেই প্রভাব নেই— লেখকের নিজস্ব স্বাদরংধনু প্রকাশিত। এই লেখাগুলি যেন যত্ন করে রাখা মায়ের পুরনো শাড়ি — প্রতিদিনের ব্যবহার্য ,কিন্তু তাতে যে আদর মাখা হাতের ছোঁয়া আছে তার মূল্য কসমিক।

________________________________

'যে পথে হাঁটছি'

চৈতালি ধরিত্রীকন্যা

প্রথম প্রকাশ : ২০০৯

প্রচ্ছদ :পল্লব সরকার

আবৃত প্রকাশন (৯৪৭৫২৪৫৮৫২)

(এখানে ব্যবহৃত ছবিটি লেখকের ফেসবুক দেওয়াল থেকে নিয়েছি)

 

পাঠ-প্রতিক্রিয়া/আলোচক: অমিত দাস  

প্রকল্পনায়: 'উত্তরবঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতি' আর্কাইভ 

No comments:

Post a Comment

যে পথে হাঁটছি...

চৈতালি ধরিত্রীকন্যা ' যে পথে হাঁটছি 'র পাঠ-প্রতিক্রিয়া  আলোচক: অমিত দাস     ১. ' কেমন করে ঠোঁট কাঁপে গরম চা দেখে ? দুটি পা...

অধিক পঠিত পোস্ট